বাড়িতে ছোট্টো লক্ষ্মী এসেছে? মেয়ের বাবা মা হওয়া যেমন এক বিশাল আনন্দের ব্যাপার,ঠিক তেমনি মাথার মধ্যে একটা চিন্তাও ঘুরপাক খায়। মেয়ে বড় হবে, তার উচ্চশিক্ষা, তারপর ভালো ঘরে বিয়ে—সব মিলিয়ে তো অনেক টাকার ধাক্কা! কিন্তু এখন থেকেই যদি একটু একটু করে প্ল্যানিং শুরু করেন, তাহলে ভবিষ্যতে মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য কারও কাছে হাত পাততে হবে না।
আপনার এই চিন্তাকে একেবারে দূর করতেই ভারত সরকারের সবচেয়ে দারুণ এবং সুরক্ষিত স্কিম হলো 'সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা' (Sukanya Samriddhi Yojana বা SSY)।
এটি এমন একটি ফান্ড, যেখানে আপনি অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে মেয়ের ২১ বছর বয়সে একটা বিশাল অঙ্কের টাকার মালিক হতে পারবেন। আসুন, কোনো ঘোরপ্যাঁচ ছাড়াই একদম সহজ ভাষায় জেনে নিই এই অ্যাকাউন্টে টাকা জমার নিয়ম এবং শেষে ঠিক কত টাকা আপনার হাতে আসবে।
কারা এই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন?
আপনার মেয়ের বয়স যদি ১০ বছরের কম হয়, তবেই আপনি তার নামে এই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। একটি পরিবারে সর্বোচ্চ দুজন মেয়ের নামে এই সুবিধা নেওয়া যায়। যমজ মেয়ে হলে অবশ্য তিনজনের নামেও খোলা যায়।
কত জমাতে হবে?
বছরে আপনাকে অন্ততপক্ষে ২৫০ টাকা জমা করতেই হবে। আর যদি আপনার সামর্থ্য থাকে, তবে বছরে সর্বোচ্চ দেড় লক্ষ (১.৫ লাখ) টাকা পর্যন্ত জমা করতে পারেন।
মাসের হিসাব:
আপনি চাইলে প্রতি মাসে ৫০০, ১০০০ বা ৫০০০ টাকা করে জমাতে পারেন। আবার কোনো মাসে হাতে টাকা না থাকলে জমা দিলেন না, পরের মাসে একসাথে দিয়ে দিলেন—সেই সুবিধাও এখানে আছে। কোনো ধরাবাঁধা ইএমআই (EMI) সিস্টেমে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কত বছর জমাতে হবে?
মাথায় রাখবেন, মেয়ে বড় হওয়া পর্যন্ত আপনাকে টানা টাকা দিতে হবে না। অ্যাকাউন্ট খোলার পর থেকে আপনাকে শুধুমাত্র প্রথম ১৫ বছর টাকা জমা করতে হবে। তারপর আর এক টাকাও দিতে হবে না, কিন্তু ২১ বছর পর্যন্ত আপনার জমানো টাকার ওপর সুদ বাড়তে থাকবে।
ম্যাচিউরিটিতে কত টাকা রিটার্ন পাবেন?
সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা এত জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ হলো এর হাই-রিটার্ন। বর্তমানে এই স্কিমে সুদের হার হলো ৮.২ শতাংশ (৮.২%), যা সাধারণ ফিক্সড ডিপোজিট (FD) বা পিপিএফ (PPF)-এর চেয়ে অনেকটাই বেশি।
চলুন দুটো উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলি:
মাসে ৩,০০০ টাকা জমালে:
ধরুন, আপনি মেয়ের জন্য প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে জমাচ্ছেন। বছরে জমল ৩৬,০০০ টাকা। ১৫ বছরে আপনার পকেট থেকে মোট জমা হবে ৫ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু যখন অ্যাকাউন্টের বয়স ২১ বছর হবে, তখন আপনি সুদ সমেত হাতে পাবেন প্রায় ১৬ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা! ভাবুন একবার, আপনি দিচ্ছেন সাড়ে পাঁচ লাখ, আর ফেরত পাচ্ছেন প্রায় ১৭ লাখ!
মাসে ৫,০০০ টাকা জমালে:
আপনি যদি প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা (বছরে ৬০ হাজার) করে জমান, তবে ১৫ বছরে আপনার মোট জমা হবে ৯ লক্ষ টাকা। আর ২১ বছর পর ম্যাচিউরিটিতে আপনার হাতে আসবে প্রায় ২৮ লক্ষ ২২ হাজার টাকার বিশাল ফান্ড!
মাঝপথে টাকার দরকার হলে কী করবেন?
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, ২১ বছরের আগে কি টাকা তোলা যাবে? হ্যাঁ, যাবে। মেয়ের বয়স যখন ১৮ বছর হবে, তখন তার উচ্চশিক্ষার খরচের জন্য আপনার জমানো মোট টাকার ৫০% তুলে নিতে পারবেন। আর মেয়ের বিয়ের সময় অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি বন্ধ করে পুরো টাকাটাই তুলে নেওয়া যাবে।
ট্যাক্স বা কর ছাড়ের ডবল ধামাকা
এই স্কিমের আরেকটা সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর পুরো টাকাটাই সম্পূর্ণ ট্যাক্স ফ্রি (Tax Free)। মানে আপনি জমার সময় যেমন ট্যাক্সে ছাড় পাবেন, ঠিক তেমনি ম্যাচিউরিটির সময় যে মোটা টাকাটা রিটার্ন পাবেন, তার থেকে সরকার এক পয়সাও ইনকাম ট্যাক্স কাটবে না। আপনার টাকা পুরোটাই আপনার।
কোথায় এবং কী কী ডকুমেন্টস দিয়ে খুলবেন?
কোনো দালালের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। সরাসরি আপনার বাড়ির কাছের যেকোনো পোস্ট অফিস বা সরকারি ব্যাংকে (যেমন এসবিআই, পিএনবি) চলে যান। সাথে নিয়ে যাবেন:
১. মেয়ের জন্মের প্রমাণপত্র বা বার্থ সার্টিফিকেট।
২. বাবা বা মায়ের আধার কার্ড এবং প্যান কার্ড।
৩. তিন কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
শেয়ার বাজার বা মিউচুয়াল ফান্ডের মতো এখানে কোনো রিস্ক নেই। এটা ১০০% ভারত সরকারের গ্যারান্টি দেওয়া একটা স্কিম। তাই মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজই অল্প কিছু টাকা দিয়ে হলেও পোস্ট অফিসে গিয়ে একটা সুকন্যা সমৃদ্ধি অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলুন। আজকের ছোট একটা সিদ্ধান্ত, কাল আপনার মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় সাপোর্ট হয়ে দাঁড়াবে।
