অনেকদিন ব্যাংকের পাসবইটা আলমারিতেই তোলা ছিল। হঠাৎ একদিন খুব দরকার পড়ায় টাকা তুলতে গেলেন, বা কাউকে ইউপিআই (UPI) করতে গেলেন। দেখলেন টাকা কোনোভাবেই যাচ্ছে না। ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে বা ফোনে মেসেজ দেখে জানতে পারলেন আপনার অ্যাকাউন্টটি 'ডরম্যান্ট' (Dormant) বা 'ইনঅ্যাকটিভ' (Inactive) হয়ে গেছে! শুনেই বুকটা ধড়ফড় করে উঠল? ভাবছেন জমানো টাকাগুলো সব গায়েব হয়ে গেল বোধহয়?
একদম টেনশন করবেন না। আপনার একটা টাকাও কোথাও যায়নি, সব ব্যাংকেই সুরক্ষিত আছে। এটা ব্যাংকের খুব সাধারণ একটা নিয়ম। আজকের দিনে কীভাবে খুব সহজে, কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই এই বন্ধ অ্যাকাউন্ট আবার আগের মতো চালু করবেন, চলুন সেটা ধাপে ধাপে জেনে নিই।
অ্যাকাউন্ট ডরম্যান্ট বা ইনঅ্যাকটিভ কেন হয়?
নিয়মটা খুব সোজা। আপনি যদি টানা এক বছর (১২ মাস) আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো টাকা না তোলেন বা জমা না দেন, তাহলে ব্যাংক সুরক্ষার খাতিরে সেটাকে 'ইনঅ্যাকটিভ' (Inactive) করে দেয়। আর যদি টানা দু-বছর (২৪ মাস) কোনো লেনদেন না হয়, তখন সেটা পুরোপুরি 'ডরম্যান্ট' (Dormant) হয়ে যায়।
রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) এই নিয়মটা করেছে আপনারই ভালোর জন্য। যাতে আপনার ফেলে রাখা অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার করে অন্য কেউ জালিয়াতি করতে না পারে। চিন্তার কিছু নেই, ডরম্যান্ট হয়ে গেলেও আপনার অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা একদম ১০০% সেফ আছে, এমনকি তাতে নিয়ম মতো সুদও (Interest) ঢুকছে।
ব্যাংকে যাওয়ার আগে কী কী গুছিয়ে নেবেন?
অ্যাকাউন্ট চালু করতে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে এই জিনিসগুলো হাতের কাছে রেডি করে নিন:
১. আপনার আসল আধার কার্ড এবং প্যান কার্ড (সাথে অবশ্যই দু-কপি জেরক্স)।
২. ব্যাংকের পাসবই এবং চেক বই (যদি থাকে)।
৩. সম্প্রতি তোলা ২-৩ কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
কীভাবে অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালু করবেন?
প্রথম ধাপ: সোজা আপনার ব্যাংকের হোম ব্রাঞ্চে চলে যান। অর্থাৎ, যে শাখায় আপনি প্রথম অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন, সেখানেই যেতে হবে। অন্য কোনো ব্রাঞ্চে গেলে কিন্তু এই কাজটা সহজে হবে না।
দ্বিতীয় ধাপ: ব্যাংকের হেল্প ডেস্কে বা ম্যানেজারের কাছে গিয়ে পরিষ্কার বলুন, "আমার অ্যাকাউন্টটা ডরম্যান্ট হয়ে গেছে, আমি কেওয়াইসি (KYC) আপডেট করে অ্যাকাউন্টটা আবার চালু করতে চাই।" ওঁরা আপনাকে একটা ছোট 'কেওয়াইসি আপডেট ফর্ম' দেবেন।
তৃতীয় ধাপ: ফর্মটা ভালো করে ফিলাপ করুন। এর সাথে আধার ও প্যান কার্ডের জেরক্সগুলো পিন করে দিন। জেরক্সের নিচে অবশ্যই নিজের একটা সই করে দেবেন (Self Attested)।
চতুর্থ ধাপ (চিঠি লেখা): অনেক সময় ব্যাংক থেকে ফর্মের পাশাপাশি একটা হাতে লেখা আবেদনপত্র বা অ্যাপ্লিকেশন জমা দিতে বলে। সাদা কাগজে খুব সহজে এই চিঠিটা লিখে দেবেন:
আবেদনের নমুনা (Application Format):
মাননীয় শাখা প্রবন্ধক (Branch Manager),
[আপনার ব্যাংকের নাম এবং শাখার নাম দিন]
বিষয়: ডরম্যান্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালু করার আবেদন।
মহাশয়,
সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি [আপনার নাম], আপনার ব্যাংকের একজন সেভিংস অ্যাকাউন্ট গ্রাহক। আমার অ্যাকাউন্ট নম্বর হলো [আপনার নম্বরটি দিন]। ব্যক্তিগত কিছু কারণে গত কয়েক মাস আমি এই অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো লেনদেন করতে পারিনি, যার ফলে এটি ডরম্যান্ট বা ইনঅ্যাকটিভ হয়ে গেছে।
আমি পুনরায় এই অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করতে চাই। আমার কেওয়াইসি (KYC) ডকুমেন্টস এই চিঠির সাথে জমা দিলাম। দয়া করে আমার অ্যাকাউন্টটি চালু করার ব্যবস্থা করে বাধিত করবেন।
ধন্যবাদান্তে,
[আপনার সই]
মোবাইল নম্বর: [আপনার নম্বর]
পঞ্চম ধাপ (লেনদেন করা): কাগজগুলো জমা দেওয়ার পর, ব্যাংক অফিসার সেটা সিস্টেমে আপডেট করে দেবেন। অ্যাকাউন্ট চালু হয়ে গেলেই, ওই দিনই ১০০ বা ২০০ টাকা অ্যাকাউন্টে জমা (Deposit) করে দিন অথবা এটিএম (ATM) থেকে তুলে নিন। ব্যস! একটা ট্রানজ্যাকশন হয়ে গেলেই আপনার অ্যাকাউন্ট আবার আগের মতো দৌড়াতে শুরু করবে।
ঘরে বসে অনলাইনে কি চালু করা যায়?
হ্যাঁ, এখন স্টেট ব্যাংক (SBI), আইসিআইসিআই (ICICI) বা এইচডিএফসি (HDFC)-এর মতো বড় ব্যাংকগুলো ঘরে বসেই 'ভিডিও কেওয়াইসি' (Video KYC)-এর মাধ্যমে ডরম্যান্ট অ্যাকাউন্ট চালু করার সুবিধা দিচ্ছে। আপনি চাইলে ব্যাংকের অফিশিয়াল অ্যাপ বা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে লগইন করে এই কাজটা করতে পারেন। তবে সবচেয়ে ভরসাযোগ্য পদ্ধতি হলো সরাসরি ব্রাঞ্চে গিয়ে পেপার জমা দিয়ে আসা।
সবশেষে মাথায় রাখার মতো ৩টি স্পেশাল টিপস:
১. ডরম্যান্ট অ্যাকাউন্ট চালু করার জন্য ব্যাংক আপনার থেকে এক টাকাও চার্জ বা ফি কাটতে পারবে না। এটা রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ ফ্রি সার্ভিস।
২. ভবিষ্যতে যাতে অ্যাকাউন্ট আবার বন্ধ না হয়ে যায়, তার জন্য প্রতি ৩-৪ মাসে অন্তত একবার ১০০ টাকা জমা দিন বা তুলে নিন। ইউপিআই (UPI) দিয়ে মোবাইল রিচার্জ করলেও অ্যাকাউন্ট অ্যাকটিভ থাকে।
৩. সাইবার প্রতারকদের থেকে সাবধান! ফোনে আসা কোনো অচেনা লিংকে ক্লিক করে 'অ্যাকাউন্ট চালু করুন' মেসেজে পাত্তা দেবেন না, ওগুলো সব স্ক্যামারদের ফাঁদ।


